পেনিনসুলা কাণ্ডে নতুন মোড়: প্রকাশ্যে আসল বিল, সিসিটিভি যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ সুজাউদ্দিনের
মদ্যপানের অভিযোগে মিলল না কোনো প্রমাণ; তদন্তের আগেই পক্ষাবলম্বনের অভিযোগে মহানগর আহ্বায়ককে শোকজ, গঠন হলো কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি
রিয়াজ উদ্দিন | কক্সবাজার
চট্টগ্রামের পাঁচ তারকা হোটেল দ্য পেনিনসুলাকে ঘিরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র অভ্যন্তরীণ বিতর্কে যুক্ত হয়েছে নতুন তথ্য। আলোচিত সেই রাতের খাবারের মূল বিল প্রকাশ্যে আসার পর অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের রাজনৈতিক নাটকীয়তা নতুন মাত্রা পেয়েছে। একই সঙ্গে এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এ এস এম সুজাউদ্দিন সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে অভিযোগকে ‘পরিকল্পিত অপপ্রচার’ বলে দাবি করেছেন।
বিলে নেই মদের অস্তিত্ব
প্রকাশিত ক্যাশ মেমো অনুযায়ী, গত ১৪ জুন রাতে চারজন অতিথির জন্য অর্ডার করা হয়েছিল মটন পায়া স্যুপ, গার্লিক নান, চিকেন-প্রন, কফি, কলার স্মুদি, কোক এবং মিনারেল ওয়াটার। এছাড়া একটি বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিগারেটও বিলের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
খাবার ও পানীয়ের মোট মূল্য ছিল ৬ হাজার ৫৭৩ টাকা ৭১ পয়সা। এর সঙ্গে সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাট যোগ হয়ে চূড়ান্ত বিল দাঁড়ায় ৮ হাজার ৩১৬ টাকা।
বিলের কোথাও কোনো ধরনের অ্যালকোহল বা মদ্যপ পানীয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
“সিসিটিভি দেখুন, সত্য বেরিয়ে আসবে”
অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সুজাউদ্দিন বলেন, ওই দিন সবাই মিলে খাবারের অর্ডার করেছিলেন এবং পরে এলাকার এক সিনিয়র ব্যক্তি পুরো বিল পরিশোধ করেন।
তিনি বলেন,
“অভিযোগকারী বলেছেন আমরা নাকি মদ্যপানের প্রস্তাব দিয়েছি কিংবা মদ্যপ ছিলাম। যদি এমন কিছু হয়ে থাকে, তাহলে হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করা হোক। সত্য উদঘাটনে আমি নিজেই তা দেখতে বলছি।”
তিনি আরও দাবি করেন, ধূমপানের বিষয়টি অনুমতি নিয়েই করা হয়েছিল এবং সেটিকে কেন্দ্র করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হচ্ছে।
যেভাবে শুরু বিতর্ক
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১৭ জুন, যখন সানজিদা সুলতানা ইভা নামে এক নারী নিজেকে এনসিপির কর্মী পরিচয় দিয়ে চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি সুজাউদ্দিন ও সাদিয়া আফরিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেন।
এর জবাবে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপি অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘কাল্পনিক’ আখ্যা দিয়ে পাল্টা বিবৃতি দেয়। সেখানে অভিযোগের পেছনে একটি নির্দিষ্ট পক্ষের ইন্ধনের কথাও উল্লেখ করা হয়।
কেন্দ্রের নজরে দলীয় শৃঙ্খলা প্রশ্ন
তবে তদন্ত চলমান অবস্থায় মহানগর কমিটির পক্ষ থেকে একতরফা অবস্থান নেওয়াকে দলীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী হিসেবে দেখেছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
এ কারণে মহানগর আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইবকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
সত্য নাকি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র?
প্রকাশিত বিল, সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের আহ্বান এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এনসিপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগের সত্যতা কিংবা অসত্যতা নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন।
এখন সবার নজর তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে
একদিকে চরিত্রহননের অভিযোগ, অন্যদিকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পক্ষাবলম্বনের বিতর্ক—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এনসিপি। ফলে কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্টই বলে দেবে, এটি কোনো ব্যক্তিগত অনৈতিকতার ঘটনা, নাকি দলের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাজানো রাজনৈতিক সংঘাত।
প্রশ্ন এখন একটাই—পেনিনসুলা কাণ্ডে সত্যের মুখোশ খুলবে, নাকি আরও ঘনীভূত হবে রহস্য?








